রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গাইড
রমজান মাস মুসলমানদের জন্য আল্লাহর বিশেষ রহমতের মাস। এই মাসে রোজা পালন, ইবাদত
বৃদ্ধি, পাপ থেকে বিরত থাকা এবং তাক্বওয়া অর্জনের মাধ্যমে একজন মুসলমান নিজের
জীবনকে নতুন ভাবে গড়ে তোলার সুযোগ পায়। রমজান মাসের গুরুত্ব অনেক বেশি।
তাই রমজান শুধু একটি মাস নয় বরং এটি আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির
প্রশিক্ষণকাল। তাই আসুন আমরা এই রমজানে, পরিপূর্ণ হক আদায় করে রোজা রাখি। আরো
বিস্তারিত জানার জন্য এই আর্টিকেলটি পড়ুন তাহলে রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত
সম্পর্কে জানতে পারবেন।
পেজ সূচীপত্রঃ রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গাইড
- রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গাইড
- রমজান মাস কুরআন নাজিলের মাস
- রমজান মাসের বিশেষ রহমত
- লাইলাতুল ক্বদরের রাতের গুরুত্ব ও ফজিলত
- লাইলাতুল ক্বদরের সম্ভাব্য রাত কত তারিখে?
- রমজানে দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সময়
- রমজানে করণীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল
- রমজানে দান-সদকার গুরুত্ব ও ফজিলত
- রোজাদারকে ইফতার করানোর সাওয়াব
- শেষ কথাঃ রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গাইড
রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গাইড
রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত, ইসলাম পাচঁটি ভিক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত! কালিমা,
নামাজ, যাকাত, রোজা, ও হজ্জ। এই পাচঁটি ভিক্তির ভিতরে রোজা একটি গুরুত্বপূর্ণ
ভিক্তি। রমজান হিজরি ক্যালেন্ডারের নবম মাস। এই মাসে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক
প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান নর, নারীর উপর রোজা ফরজ করেছেন। রোজা মানুষের ভেতরে
আত্মসংযম, ধৈর্য এবং আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে। এই মাসের রোজা সম্পর্কে মহান আল্লাহ
কুরআন মাজীদে বলেনঃ-
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের
পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারো। (সুরা বাকারা ২ঃ১৮৩) এই
আয়াত থেকে বোঝা যায় রোজার মূল উদ্দেশ্য হলো তাক্বওয়া অর্জন করা। রোজার ফজিলত
সম্পর্কে হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ রোজা ঢাল স্বরূপ। সুতরাং
অশ্লীলতা করবে না, এবং মূর্খের মতহ কাজ করবে না।
যদি কেউ তার সাথে ঝগড়া করতে চায়, তাকে গালি দেয়, তবে সে যেন দুই বার বলে, আমি
রোজা আছি। ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, অবশ্যই রোজা পালনকারীর মুখের গন্ধ
আল্লাহর নিকট মিসকের সুগন্ধির চাইতেও উৎকৃষ্ট, সে আমার জন্যা আহার পান ও কামাচার
পরিত্যাগ করে। রোজা আমারই জন্য। তাই এর পুরস্কার আমি নিজেই দান করবো। আর প্রত্যেক
নেক কাজের বিনিময় দশ গুণ। বুখারীঃ-১৮৯৪। সাহল (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ
জান্নাতের রাইয়্যান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে কিয়ামতের দিন রোজা
পালনকারীরাই প্রবেশ করবে। তাদের ব্যতীত আর কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে
না। ঘোষণা দেয়া হবে, রোজা পালনকারীরা কোথায়? তখন তারা দাঁড়াবে। তারা ব্যতীত আর
কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না। তাদের প্রবেশের পরই দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে।
যাতে করে এ দরজাটি দিয়ে আর কেউ প্রবেশ না করে। সহিহ বুখারীঃ ১৮৯৬। রোজাদারের
মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক প্রিয়। (বুখারি, ১৯০৪) এটি
প্রমাণ করে আল্লাহর কাছে রোজাদারের সম্মান কত বেশি।
রমজান মাস কুরআন নাজিলের মাস
রমজান মাসের সবচেয়ে বড় মর্যাদা হলো এই মাসেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। মহান
আল্লাহ কুরআন মাজীদে বলেনঃ- রমজান মাস সেই মাস, যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে
মানুষের জন্য পথনির্দেশ, হিদায়াতের সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য
নির্ণায়ক হিসেবে। (সুরা বাকারা ১৮৫) এ কারণেই রমজানে কুরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব
অত্যন্ত বেশি। কুরআন সংরক্ষণ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেনঃ
আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি এবং আমি নিজেই এর হেফাজত করবো।
সুরা (আল হিজর ০৯) কুরআন শিক্ষা করা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, আলী (রাঃ) থেকে
বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
তোমাদের মধ্যে সবোউত্তম ঐ ব্যক্তি যিনি কুরআন মাজীদ শিক্ষা করেন এবং ওপর কে
শিক্ষা দেন। (তিরমিজি, ২৯০৯) কুরআন এবং রোজার ফজিলত সম্পর্কে হাদিসে এসেছে,
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, রোজা ও কুরআন কিয়ামতের দিন
বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, হে রব! আমি তাকে দিনে খাবার ও প্রবৃত্তি
থেকে বিরত রেখেছি, তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবেঃ আমি
তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি (তিলাওয়াত ও কিয়ামুল লাইলের জন্য) তাই তার
ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহন করুন। তখন তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।
(মুসনাদে আহমদ, ৬৬২৬)
কুরআন পড়ার মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) থেকে
বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ
আল্লাহ তাআলার কিতাবের একটি হরফ যে ব্যক্তি পাঠ করবে তার জন্য এর সাওয়াব আছে। আর
সাওয়ার হয় তার দশ গুণ হিসেবে। আমি বলি না যে, আলিফ- লাম-মীম, একটি হরফ, বরং আলিফ
একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ। (তিরমিজি, ২৯১০)
রমজান মাসের বিশেষ রহমত
রমজান শুরু হলে আল্লাহ তাআলা বান্দাদের জন্য বিশেষ রহমতের দরজা খুলে দেন। মহানবি
হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) হাদিসের ভিতরে বলেন, যখন রমজান শুরু হয়, জান্নাতের দরজাগুলো
খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত
করা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৮৯৯) এই হাদিস প্রমাণ করে রমজান হলো ইবাদতের
জন্য সবচেয়ে সহজ সময়। কারুন এই মাসে শয়তানাকে শৃঙ্খলার আবদ্ধ করে রাখে হয়।
রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত, রমজান মাসের তিন ভাগ প্রথম দশ দিন রহমত, দ্বিতীয় দশ
দিন মাগফিরাত, এবং তৃতীয় দশ দিন নাজাত। মহানবি হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) হাদিসের
ভিতরে বলেন, হে মানুষ! তোমাদের কাছে এক মহান বরকতময় মাস উপস্থিত হয়েছে, এই মাসের
প্রথম অংশ রহমত, মধ্যভাগ মাগফিরাত এবং শেষ ভাগ জাহান্নাম থেকে মুক্তি। (বায়হাকী
শরীফ ৩৩৩৭) তাহলে এই মাসে রহমত, মাগফিরাত, এবং নাজাত রয়েছে।
রমজান মাস সম্পর্কে কুরআন এবং হাদিসে অসংখ্য ফজিলতের কথা বর্ণনা রয়েছে। আরও একটি
হাদিসে আবূ হুরাইরা থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, বলেছেনঃ যে
ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াব লাভের আশায় রমজানের রোজা পালন করে, তার পূর্বের গুনাহ
ক্ষমা করে দেয় হয়। সুবহানাল্লাহ, (সহিহ বুখারী,৩৮) এতো ফজিলত থাকা সত্তেও আমরা
অনেকেই রোজা রাখিনা। আফসোস দূর্ভাগ্য আমাদের জন্য।
আরো একটি হাদিসে রোজার ফজিলত সম্পর্কে বলা হয়েছে, আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে
বর্ণিতঃ তিনি বলেন আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, যে
ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় এক দিনও রোজা পালন করে, আল্লাহ তায়ালা তার মুখমন্ডলকে
জাহান্নামের আগুন হতে সত্তর বছরের রাস্তা দূরে সরিয়ে নেন। (সহিহ বুখারী, ২৮৪০)
জাহান্নামের আগুনের তাপমাত্রা এতো বেশি যে হাজার হাজার বছরের রাস্তা দূর থেকেও
তাপ পাওয়া যাবে। জাহান্নামের আগুন থেকে আল্লাহর তায়ালার কাছে পানাহ চাই। আমিন,
লাইলাতুল ক্বদরের রাতের গুরুত্ব ও ফজিলত
রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত, লাইলাতুল ক্বদর সম্পর্কে মহান আল্লাহ কুরআন মাজীদে
বলেন, লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। (সুরা কদর ৯৭ঃ৩) অর্থ্যাৎ (৮৩
বছর ৪ মাস ইবাদত করার সমান), এই রাতের মর্যাদা সম্পর্কে হাদিসে এসেছে, আবূ
হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন রসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, বলেছেনঃ যে
ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বদরে ঈমানের সাথে সাওয়াবের লাভ আশায় রাত জেগে ইবাদত করে, তার
পিছনের সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করা হবে। আর যে ব্যক্তি ঈমানসহ সওয়াবের লাভের আশায় রোজা
পালন করবে, তারও অতীতের সমস্ত গোনাহ মাফ করা হবে। (সহিহ বুখারী, ১৯০১)
আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রমজান মাসের মাঝের দশকে ইতিকাফ করেন। বিশ তারিখ অতীত হওয়ার সন্ধ্যায় এবং একুশ তারিখের শুরুতে তিনি এবং তাঁর সঙ্গে যাঁরা ইতিকাফ করেছিলেন সকলেই নিজ নিজ বাড়িতে প্রস্থান করেন এবং তিনি যে মাসে ইতিকাফ করেন ঐ মাসের যে রাতে ফিরে যান সে রাতে লোকদের সামনে ভাষণ দেন। আর তাতে মাশাআল্লাহ, তাদেরকে বহু নির্দেশ দান করেন, অতঃপর বলেন যে, আমি এই দশকে ইতিকাফ করেছিলাম। এরপর আমি সিদ্ধান্ত করেছি যে, শেষ দশকে ইতিকাফ করবো।
যে আমার সংগে ইতিকাফ করেছিল সে যেন তার ইতিকাফস্থলে থেকে যায়। আমাকে সে রাত
দেখানো হয়েছিল, পরে তা ভুলিয়ে দেয় হয়েছে। আল্লাহর রাসূল (সাঃ) শেষ দশকে ঐ রাতের
তালাশ কর এবং প্রত্যেক বেজোড় রাতে তা তালাশ করো। আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, ঐ রাতে
আমি কাদা-পানিতে সিজদা করছি ঐ রাতে আকাশে প্রচুর মেঘের সঞ্চার হয় এবং বৃষ্টি হয়।
মসজিদে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) এর নামাজের শেষে ফিরে বসেন তখন আমি তাঁর দিকে তাকিয়ে
দেখতে পাই যে, তাঁর মুখমন্ডল কাদা - পানি মাখা। (সহিহ বুখারীঃ ২০১৮)।
দোয় কবুলের নিশ্চয়তা, হাদিস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় এই রাতে
ইবাদর করে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। এই রাতে প্রচুর ফেরেশতা
পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং সকাল পর্যন্ত শান্তি ও রহমত বর্ষিত হতে থাকে, যা বান্দার
দোয়া কবুলের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। এই রাতে সর্বোত্তম দোয়া কোনটি? হযরত আয়েশা
(রাঃ) নবিজি (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, কদরের রাতে কোন দোয়াটি পড়বেন। নবিজি
(সাঃ) তাকে এই দোয়াটি পড়তে শিখিয়েছিলেন।
- দোয়াটি হলো আরবিঃاللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
- উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নী।
- অর্থঃ হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা করা পছন্দ করেন। অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন। (ইবনে মাজাহ ৩৮৫০)
লাইলাতুল ক্বদরের সম্ভাব্য রাত কত তারিখে?
উবাদা ইবনুস সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, একদিন নবি (সাঃ) আমাদেরকে
লাইলাতুল ক্বদরের নির্দিষ্ট তারিখ অবহিত করার জন্য বের হয়েছিলেন। তখন দুজন
মুসলমান ঝগড়া করছিল। তা দেখে তিনি বললেন, আমি তোমাদেরকে লাইলাতুল ক্বদরের সংবাদ
দিবার জন্য বের হয়েছিলাম, তখন অমুক অমুক ঝগড়া করছিল, ফলে তার নির্দিষ্ট তারিখের
পরিচয় হারিয়ে যায়। সম্ভবত, এর মধ্যে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তোমরা নবম,
সপ্তম ও পঞ্চম রাতে তা তালাশ কর। (সহিহ বুখারি, ২০২৩)
আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাঃ) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ
করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।
(২০২০)আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমের সুরা ক্বদরে ঘোষণা করেছেন লাইলাতুল ক্বদর
হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সহিহ শুদ্ধ হাদীস থেকে জানা যায় যে, লাইলাতুল ক্বদর
রমজানের শেষ দশ দিনের যে কোন বিজোড় রাত্রিতে হয়ে থাকে। বিভিন্ন সহীহ হাদিসে ২১,
২৩, ২৫, ২৭, ২৯ তারিখে লাইলাতুল ক্বদর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখিত আছে। হাদীসে এ
কথাও উল্লেখিত আছে, যে কোন একটি নির্দিষ্ট বিজোড় রাত্রিতেই তা হয় না।
(অর্থাৎ কোন বছরে ২৫ তারিখে হল, আবার কোন বছরে ২১ তারিখে হল এভাবে। আমাদের দেশে
সরকারী আর বেসরকারীভাবে জাঁকজমকের সঙ্গে ২৭ তারিখের রাত্রিকে লাইলাতুল ক্বদরের
রাত হিসেবে পালন করা হয়। এভাবে মাত্র একটি রাত্রিকে লাইলাতুল ক্বদর সাব্যস্ত করার
কোনই হাদীস নাই। লাইলাতুল ক্বদরের সওয়াব পেতে চাইলে ৫ টি বিজোড় রাত্রেই তালাশ
করতে হবে।
রমজানে দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সময়
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিন জনের দোয়া ফিরিয়ে দেয়া হয় না, ন্যায়পরায়ণ
শাসকের দোয়া, রোজাদারের ইফতারের সময়কালীন দোয়া এবং মাজলুমের দোয়া। আল্লাহ
তাআলা একে নাজমের দোয়া মেঘমালার উপর তুলে নেন, তার জন্য আকাশের দরজা সমূহ
উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার ইজ্জত ও সম্মানের শপথ! কিছু
দেরিতে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করবো। (তিরমিজি ২৫২৬) সাহরির সময় বা রাতের শেষ
তৃতীয়াংশ দোয়া কবুলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বরকতময় সময়। এই সময়টিকে
হাদিসের পরিভাষায় সাহরি বা নিশুতি রাত বলা হয়।
সাহরির সময় বা রাতের শেষ তৃতীয়াংশ দোয়া কবুলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
বরকতময় সময়। আল্লাহ তাআলার প্রথম আসমান অবতরণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেন আমাদের রব প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশ অবতরণ
করেন এবং ঘোষণা করেন, কে আছো যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দিব, কে আছো যে
আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি থাকি তা দান করবো। কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে,
আমি তাকে ক্ষমা করে দিব, এইভাবে প্রতি রাতে আল্লাহ সুবহানুতায়ালা রাতের শেষ
তৃতীয়াংশে এসে ফজর পর্যন্ত বান্দা-বান্দীদের বলতে থাকেন (সহীহ মুসলিম)
রোজার সময় দোয়া কবুলের আরেকটি উত্তম এবং শ্রেষ্ঠ সময় হল সারাদিন রোজা রেখে,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইফতারের সময় রোজাদারের
অবশ্যই একটি দোয়া আছে, যা কবুল হয়। আবু মালাইকা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু
বলেন, আমি আব্দুল্লাহ বিন আমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কে ইফতারের সময় বলতে
শুনেছি, হে আল্লাহ! আমি আপনার দয়া ও অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি যা সব কিছুর উপর
পরিবেপ্ত, যেন আপনি আমাকে ক্ষমা করেন, (ইবনে মাজাহ ১৭৫৩)
তাই ইফতারের সময় বেশি বেশি দোয়া করা উচিত সমস্ত কাজ তাড়াতাড়ি পরিসমাপ্তি করে পরিবারের সবাইকে একত্রিত নিয়ে এই সময় বেশি করে দোয়া করা দরকার কারণ ইফতারের সময় দোয়া কবুলের অন্যতম একটি সময়।
রমজানে করণীয় গুরুত্বপূর্ণ আমল
রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত, রমজান মাসকে সফল করতে কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল নিয়মিত
করা প্রয়োজন। প্রথম যে আমলটি আমাদের বেশি করা দরকার সেটি হল পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ
নামাজ। কারণ আমরা দেখতে পাই অনেক রোজাদার রয়েছে যারা রোজা রাখে অথচ নামাজ আদায়
করে না, রোজা হচ্ছে একটি ফরজ, আর দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া ফরজ, ইসলামী
প্রধান স্তম্ভ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ইসলামের
ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের উপর। তার মধ্যে অন্যতম হল নামাজ কায়েম করা। (সহীহ
বুখারী, ৮)
নামাজ মানুষের গুনাহ মুছে দেয়, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
একটি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, যদি কারো বাড়ির সামনে একটি সচ্ছ নদীর নহর থাকে এবং সে
তাতে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করে, তবে কি তার শরীরে কোন ময়লা থাকবে? সাহাবায়ে
কেরাম বললেন না ইয়া রাসুল আল্লাহ, (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কোন ময়লা
থাকবে না। তখন তিনি বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উদাহরণও ঠিক সেরকম, এর মাধ্যমে
আল্লাহ তাআলা তার বান্দার গুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেন। (সহি বুখারী ৫২৮)
যদি নিয়মিতভাবে ঠিকঠাক মত নামাজ আদায় করা হয়ে থাকে সে নাজাত পাবে এবং সফল হবে।
যদি নামাজ নষ্ট হয়ে থাকে সে ব্যর্থ ও বিপর্যস্ত হবে। যদি ফরজ নামাজের মধ্যে কিছু
কমতে থাকে তবে মহান আল্লাহ তায়ালা বলবেন দেখো, বান্দার কোন নফল নামাজ আছে কিনা।
থাকলে তা দিয়ে ফরজের এই ঘাট দিয়ে পূরণ করা হবে। তারপর সকল কাজের বিচার পালা
ক্রমে নেয়া হবে। (ইবনে মাজাহ ১৪২৫) নামাজের গুরুত্ব এত বেশি তাই আসুন রমজান মাসে
রোজার পাশাপাশি নামাজ গুরুত্ব সহকারে আদায় করি।
তাহলে রমজানের, যে হক সেটি পরিপূর্ণ আদায় হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা
আমাদের সবাইকে রমজানের পরিপূর্ণ হক আদায় করে রোজা রাখার তৌফিক দান করুন আমিন।
ফরজ নামাজের পাশাপাশি রমজান মাসে আমাদের কে আরেকটি লম্বা নামাজ পড়তে হয়, তার
নাম হল তারাবি নামাজ। তারাবির নামাজ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি রোজা রাখল এবং তারাবির নামাজ আদায় করল, আল্লাহ
সুবাহানাহু তায়ালা তার পেছনের সমস্ত গুনাহ খাতা গুলো মাফ করে দিবেন,
সুবহানাল্লাহ।
রমজানে দান-সদকার গুরুত্ব ও ফজিলত
রমজান মাসে দান সদকার গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ হাদিস
রয়েছে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হাদিস হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম রমজান মাসের অতুলনীয় দান করতেন, আব্দুল ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু
তা'আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর রমজান মাসে যখন
জিব্রাইল (আলাইহিস সালাতু আসসালাম) তার সাথে দেখা করতেন, তখন তিনি আরো বেশি
দানশীল হয়ে যেতেন। তিনি প্রবাহমান বায়ুর চেয়েও বেশি দ্রুতগতিতে দান
করতেন।(সহীহ বুখারী, ৬)
সর্ব উত্তম দান কোনটি, আনাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে জিজ্ঞাসা করা হল, কোন সদাকা বা
দান সবচেয়ে উত্তম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনি বললেন
রমজান মাসের দান অন্য সময় যেকোনো সময় থেকে দান করার চেয়ে উত্তম। (তিরমিজি,
৬৬৩) রমজান মাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হল কোরআন তেলাওয়াত করা কারণ এ মাসের
সম্মান দেয়া হয়েছে মূলত কোরআন নাজিলের জন্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম, যখন রমজান মাস আসতেন,তখন তিনি অনেক বেশি কোরআন তেলাওয়াত করতেন।
রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলতরমজান মাসে জিব্রাইল আলাইহিস সালাম এবং রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর একে অপরকে কোরআন তেলাওয়াত করে শুনাতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন
জিব্রাইল (আলাহিস সালাম), রমজানের প্রতিরাতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম) এর সাথে দেখা করতেন এবং তারা একে অপরকে কোরআন শুনাতে (দাউর করতেন)।
(সহীহ বুখারী, ৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ বছরে দুবার কোরআন তেলাওয়াত শেষ
করেছেন, ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে গোপনে বলেছেন যে, জিব্রাইল আলাইহিস সালাম
প্রতি বছর আমার সাথে একবার কুরআন রিভিশন করতেন, কিন্তু এই বছর তিনি আমার সাথে
দুইবার কোরআন তেলাওয়াত রিভিশন করেছেন। এতে আমি বুঝতে পারছি যে আমার মৃত্যুর সময়
ঘনিয়ে এসেছি।(সহি বুখারী ৪৬২৪)
রোজাদারকে ইফতার করানোর সাওয়াব
রোজাদারকে ইফতার করানোর অনেক বেশি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
বলেছেন যে ব্যক্তি কোন রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে ওই রোজাদারের সমান সওয়াব পাবে,
তবে এতে রোজাদারের সব থেকে বিন্দুমাত্র কমানো হবে না। (তিরমিজি, ৮০৭) রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন তোমরা একটি খেজুরের টুকরো সদকা করে
হলেও জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে রক্ষা করো।
ইসলাম এতটাই মানবতার ধর্ম যে শুধুমাত্র নিজে খাবো আত্মীয়-স্বজন আর পরিবার পাড়া
প্রতিবেশী না খেয়ে থাকবে এটা কখনো হয়না। এজন্যই তো বলা হয় ইসলাম একমাত্র
মানবতার ধর্ম। তাই আসুন যারা রোজাদার রয়েছে আমরা তাদেরকে সাধ্য অনুযায়ী ইফতার
করানোর চেষ্টা করব। কারণ যদি কোন রোজাদারকে ইফতার করায়। তাহলে আমার রোজা হলেও
হতে পারে। যাকে ইফতার করাবো তার রোজা হলেও হতে পারে। কিন্তু রোজাদারকে ইফতার
করানোর যে সওয়াব রোজার সমপরিমাণ সেই সওয়াব আমরা পেয়ে যাব, ইনশাআল্লাহ
শেষ কথাঃ রমজান মাসের গুরুত্ব, ফজিলত ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গাইড
রমজান মাস আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ উপহার। এই মাসে সঠিকভাবে রোজা পালন,
এবাদত বৃদ্ধি এবং ভালো কাজের মাধ্যমে মানুষ নিজের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে। তাই
প্রত্যেক মুসলমানের উচিত রমজান মাসকে মূল্যবান মনে করে সর্বোচ্চ এবাদত করা, অনেক
আমলে নিয়োজিত করা। বেশি বেশি তাওবা করা, বেশি বেশি জিকির করা, বেশি বেশি কোরআন
তেলাওয়াত করা, বেশি বেশি নফল নামাজ পড়া, বিশেষ করে তাহাজ্জুতের নামাজটি আদায়
করা।
সর্বশেষ কথা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তিনি বলেছেন, যে
ব্যক্তি রমজান পেল রমজানের পরিপূর্ণ হক আদায় করল আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'য়ালা
তার গোনাহ এমনভাবে ক্ষমা করে দেন, যেন আজকেই সে তার মায়ের পেট থেকে পৃথিবীতে
ভূমিষ্ঠ হলো। প্রাক্ষান্তরে কোন ব্যক্তি যদি রমজান পাওয়ার পরেও নিজের গুনাহ খাতা
মাফ করতে না পারে তাহলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার
ব্যাপারে বদ দোয়া করেছেন। তাই আসুন আমরা রমজানের পরিপূর্ণ হক আদায় করে রোজা
রাখি।



সকল বিশ্ব এর নিতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url